ইসলাম সার্বজনীন এক জীবনাদর্শ, যা মানুষকে এমন নীতি-নৈতিকতা ও শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়ে থাকে যার মাধ্যমে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, ধন-সম্পদ ও মান-মর্যাদার হিফাজত হয়। ইসলাম মানবজাতির পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। এতে জীবনের প্রতিটি বিষয় সুবিন্যস্তভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে মানুষের যা কল্যাণ তা গ্রহণ এবং যা অকল্যাণ তা পরিহার করার জন্য সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ রয়েছে।
আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন ইরশাদ করেন:-
যে নিজেকে শুদ্ধ করে, সেই সফলকাম হয়। এবং যে নিজেকে কলুষিত করে, সে ব্যর্থ মনোরথ হয়। [সূরা আশ-শামস, আয়াত ৯-১০]
নিষিদ্ধ পদ্ধতিতে কবর / মাজার যিয়ারত করাঃ
কবর যিয়ারত করা ইসলামের একটি নির্দেশিত বিষয় হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে যে ধরনের যিয়ারত শুরু হয়ে গেছে, সেগুলো পরিপূর্ণ হারাম। যারা অজ্ঞ, তারা নির্দিষ্ট দিন সমূহে ফুল দিয়ে মৃতের কবর কে সাজিয়ে আবার একজন হুজুর কে নিয়ে এসে দোয়ার ব্যবস্থা করে। এই সকল পদ্ধতিতে কবর যিয়ারত করা সম্পূর্ণ রূপে হারাম। ইসলাম আমাদেরকে কবর যিয়ারত করতে শিখিয়েছে; ফুল দিয়ে পূজা করতে শেখায়নি।
কবর যিয়ারতের নামে কিছু লোক কোন মাজারে যেয়ে সেই পীর বা আউলিয়ার কাছে অনেক কিছু চেয়ে থাকে এবং তাদের সন্তুষ্টির জন্য বিভিন্ন প্রকার সাদকা বা মান্সিক করে থাকে। তারা সকলেই মনে করে যে, তাদের চাওয়া অনুসারে পীর-আউলিয়াদের দেয়ার মত সকল ক্ষমতাই আছে। আর তাদের এইরূপ কল্পিত আকিদা সম্পূর্ণ রূপে হারাম এবং শিরকি গুনাহ। প্রত্যেকেরই মনে রাখা উচিৎ যে, মানুষ মরে গেলে তার সকল ক্ষমতাই শেষ হয়ে যায়। পীর-আউলিয়া-গনও এর থেকে ব্যতিক্রম নয়। আল্লাহর সর্ব শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের-ই এই সকল বিষয়ে কোন ক্ষমতা নেই, আর অন্য আত্মার যে কি ক্ষমতা আছে, তা নিজেরা চিন্তা করে বের করে নিবেন এবং পূর্বের শিরকি গুনা সমূহের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাবেন। আল্লাহ সর্বাবস্থায় বান্দার পাপ ক্ষমা করার জন্য অপেক্ষমাণ।
আমরা যদি কেউ আমাদের পিতা-মাতার জন্য নিজে দোয়া করি, তাহলে যতটুকু কাজে লাগবে, অপর পক্ষে তামাম জাহানের সকল মুসলমান নারী-পুরুষ যদি এক সাথে আমাদের পিতা-মাতার জন্য দোয়া করে, তাহলেও ততটুকু কাজে লাগবে না। কারণ: কোন ব্যক্তি মৃত্যু বরন করার সাথে সাথেই তার সকল আমল নামা বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীর জন্য শুধুমাত্র তিনটি পথ খোলা হয়ে থাকে, তার মধ্যে একটি হল মৃত ব্যক্তির সন্তান সমূহ।
কবরবাসীর পূজা কিংবা কবরের উপর প্রাসাদ নির্মাণ করা হারামঃ
মহান আল্লাহ্ তা'আলা মানব জাতির জন্য নির্ভেজাল ও সুসামঞ্জস্যপূর্ণ এমন এক জীবন ব্যবস্থা দান করেছেন, যা থেকে আমরা যেমন সত্য ও সঠিকের দিকনির্দেশনা পাই তেমনি পাই মিথ্যা ও ভ্রান্তির পরিচিতিও। এটা এ জন্যে যে, দয়াময় আল্লাহ্ আমাদের কল্যাণ চান। তাই কোথায়, কোন পথের কোন বাঁকে ওঁত পেতে আছে অকল্যাণ সে ধারণা আমাদেরকে পূর্ব হতেই জানিয়ে দিয়েছেন; যাতে আমরা সতর্ক থাকতে পারি।
বান্দার জন্য ভালবাসার সবটুকু কিংবা সর্বোচ্চটুকু হওয়া উচিত তার প্রতিপালকের প্রতি। যেমনটি তিনি বলেছেন:
তারপর যখন তোমরা হজ্জের অনুষ্ঠানাদি সমাপ্ত করবে তখন আল্লাহকে এমনভাবে স্মরণ করবে যেভাবে তোমরা তোমাদের পিতৃপুরুষদের স্মরণ করে থাক, অথবা তারচেয়েও অধিক। [সূরা আল-বাকারা: ২০০]
সুতরাং পূর্বপুরুষ বা সম্মানিত কোন ব্যক্তিত্ব যত প্রিয়ই হোক না কেন; আল্লাহ্ বলছেন যে, তার চেয়েও অধিক ভালবাসা বান্দার কাছ থেকে তাঁর প্রাপ্য। বান্দার উচিত অন্তরে তার রবের প্রতি ভালবাসার সর্বোচ্চ মাত্রাকে জাগরিত রেখে তাঁকে স্মরণ করা।
অন্যত্র তিনি বলেন:
আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহ্ ছাড়া অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে, তারা তাদেরকে ভালবাসে আল্লাহর ভালবাসার মতই ; পক্ষান্তরে যারা ঈমান এনেছে তারা আল্লাহকে সর্বাধিক ভালবাসে। কতইনা উত্তম হত যদি এ জালেমরা পার্থিব কোন কোন আযাব প্রত্যক্ষ করেই উপলব্ধি করে নিত যে, যাবতীয় ক্ষমতা শুধুমাত্র আল্লাহরই জন্য এবং আল্লাহর আযাবই সবচেয়ে কঠিনতর। [সূরা আল-বাকারা: ১৬৫]
সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, যারা অন্য কোন মানুষকে আল্লাহর আল্লাহর ভালবাসার মত করে ভালবাসে তারা মূলত সেই ব্যক্তিকে নিজ নিজ অন্তরে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে নিয়েছে। আর আল্লাহর জন্য সমকক্ষ নির্ধারণ করা সুস্পষ্ট শিরক। পরন্তু আয়াতের পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে যে, মুমিনগণই শুধুমাত্র আল্লাহকে তাদের অন্তরের সর্বোচ্চতা দিয়ে ভালবাসে অর্থাৎ, এর ব্যতিক্রমীরা ঈমানের দিক থেকে সুস্পষ্ট বিপদাশংকায় নিমজ্জিত।
তাহলে একথা সুস্পষ্ট যে, যারা কবরবাসীকে ভালবাসার কারণে কবরের উপরে সুরম্য দেয়াল বা প্রাসাদ নির্মাণ করে অথবা কবরবাসীকে ডাকে তারা প্রকারান্তরে সেই কবরবাসীকে আল্লাহর সমকক্ষ হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে। যার ভয়াবহ পরিণাম সুস্পষ্ট শিরক!
রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ( لَا تَجْلِسُوا عَلَى الْقُبُورِ وَلَا تُصَلُّوا إِلَيْهَا) কবরের উপর (আসন গেঁড়ে বা ইমারত বানিয়ে) বসো না এবং তার দিকে (কবরের দিকে) সালাত আদায় করো না। [মুসলিম: ১৬১৩, আবূ দাউদ: ২৮১০, তিরমিযী: ৯৭১, আহমাদ: ১৬৫৮৪]
কবরের উপর মসজিদ স্থাপন করা ও তাতে বাতি জ্বালানো প্রসঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ হতে আরো বর্ণিত আছে যে: তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কবরসমূহে নারী যিয়ারতকারিনীদের, সেখানে (কবরের উপর) মসজিদ স্থাপনকারীদের এবং সেসবে (কবরসমূহে) বাতি জ্বালানোওয়ালাদের প্রতি অভিসম্পাত বর্ষণ করেছেন। [আবু দাউদ: ২৮১৭, তিরমিযী: ২৯৪, নাসায়ী: ২০১৬, আহমাদ: ১৯২৬, ২৪৭২, ২৮২৯, ২৯৫২]
এছাড়াও কবরস্থানে মসজিদ তৈরি করা কিংবা মসজিদে কবর বানানো ইসলামে হারাম বলে ঘোষিত হয়েছে। কেননা কবরের প্রতি সম্মান দেখানো ও তাতে ইবাদত করা পর্যায়ক্রমে শির্কের মত অধঃপতনের প্রতি মানুষকে নিয়ে যায়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: আল্লাহ তাআ’লার অভিশাপ ইহুদি ও খৃষ্টানদের উপর তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছে। [বুখারী ও মুসলিম]
ওরস পালন করা বা মাজার পূজা করাঃ
ওরস অর্থই কারও মৃত্যু দিবসকে বাৎসরিক ভাবে ঘটা করে পালন করা। আমাদের দেশে সাধারণত পীর, পাগলা বাবা, ফকির উপাধি ধারি ব্যক্তিগণের মৃত্যু দিবসকে তাদের জীবিত কালীন কিছু অনুসারী গনের সমন্বয়ে গঠিত রম-রমা ভাবে পালিত উৎসবকেই ওরস বলে। অনুসারীগণ যদিও নামাজ-কালামের ধারে-কাছে না থাকলেও তাদের ধারনা যে, যার নামে তারা ওরস করছে, তিনি যদি খুশি থাকেন, তাহলে আর পর-কালীন মুক্তির জন্য কোন প্রকার অসুবিধা নেই। কারণ যার উদ্দেশ্যে ওরস করা হচ্ছে, সেই ব্যক্তির দ্বারাই তাঁর সকল অনুসারীদের জন্য মুক্তির ব্যবস্থা করা সম্ভব (নাউজুবিল্লাহ)।
আসলে ওরস মানে কিছু ভণ্ড লোকদের সমন্বয়ে গাজা, ভাং এবং অন্যান্য অবৈধ নেশাযুক্ত সামগ্রী সরকারের পুলিশ বাহিনীর উপস্থিতিতে বৈধ ভাবে খেয়ে ফকিরান্তি বা সেই দরবার সংক্রান্ত বিভিন্ন দলীয় সংগীত পরিবেশন এবং মাতলামি সহ বাস্তব ভণ্ডামির একটা বহিঃপ্রকাশ মাত্র। ইসলামে এর কোন অস্তিত্ব নেই। স্মরণ করা উচিৎ যে, যদি কারও ওরস ইসলামে জায়েজ থাকত, তাহলে সর্ব প্রথমে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর ওরসের ব্যবস্থা করা হত।
অথচ রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “তোমারা আমার কবরকে সিজদার স্থানে পরিণত করো না, কারণ তোমাদের পূর্ববর্তীদের ধ্বংস হওয়ার কারণ ছিল তাদের নবীদের কবরকে সিজদার স্থানে রূপান্তর করা”।
বায়েজিদ বোস্তামীর মাজারের যে বিষয়টি লক্ষণীয় মনে হয়েছে, তাহলো সেখানকার কচ্ছপ গুলোর গায়ে শেওলা পরে এমন একটা অবস্থা হয়ে গেছে যে, দেখলেই গা শির শির করে, অথচ কিছু লোক সেই কচ্ছপের গায়ে হাত দিয়ে সেই ময়লা আবার কল্যাণ লাভের আশায় নিজের মুখে শরীরে লাগায়। একটা গাছে মনে হয় লক্ষাধিক সুতা বাধা আছে, কারণ হল ঐ গাছে নিয়ত করে সুতা বাধলে না-কি সকল প্রকার মুশকিল আছান হয়ে যায়। এই ধরনের তথ্য মানা তো দূরে থাকুক, চিন্তা করাও বিশাল শিরকি বা কবিরা গুনাহ। সুন্নাতের দৃষ্টিতে মাজারের সকল কার্যক্রম হারাম।
আসুন সংক্ষেপে জেনে নেয়া যাক যে, কবরের উপর দেয়াল বা প্রাসাদ কেন নির্মাণ করা হয়:- ১) ইবাদাত, ২) ব্যবসা ও ৩) সংরক্ষণ।
১) ইবাদাত: একটা গোষ্ঠী আছে যারা অতিভক্তি, ভালবাসা, শ্রদ্ধার সাথে সাথে শয়তান কর্তৃক প্ররোচণায় নিপতিত হয়ে নিজেদের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের ভাস্কর্য নির্মাণ করতে শুরু করে, তারপর পর্যায়ক্রমে তাতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে শুরু করে, তারপর ঘরে ঘরে তা স্থাপন করে এবং অবশেষে শয়তান তাদেরকে দিয়ে ঐসব ভাস্কর্য তথা মূর্তির পায়ে কিংবা বেদীতে আন্তরিক, নযর-মান্নত এমনকি মস্তক নোয়ানো বা সিজদা করার মত ইবাদাত আদায় করতে সক্ষম হয়। ইসলাম যাকে সুস্পষ্টভাবে বড় শিরক বলে আখ্যায়িত করেছে এবং যার পরিণতি আক্বীদা-বিশ্বাসে ব্যক্তি ইসলামের সীমানা থেকে বহিস্কার হয়ে যায়, সমাজে তার নাম আব্দুর রহমান কিংবা বদর উদ্দীন যাই হোক না কেন।
২) ব্যবসা: সমাজের কিছু ধূরন্ধর মানুষেরা যখন উপরোল্লেখিত মূর্খ ও বিভ্রান্ত একটা গোষ্ঠীর সন্ধান পেয়ে যায়, তখন শয়তানের চক্রান্তে ও প্ররোচণায় তাদের মাথায় ব্যবসায়ী একটা চিন্তা খেলে যায়। তারা তখন শক্তি ও বুদ্ধিমত্তা অনুযায়ী ব্যবসার কাঠামো সাজিয়ে ফেলে এবং মাজার দখল করে বসে। এজন্য দেখবেন প্রত্যেক মাজারে খাদেম রয়েছে, কি কাজ খাদেমের? মৃত ব্যক্তি কি খেদমত নেন তার কাছ থেকে? সে মূলত জীবিত লোকদের চোখে ধোঁয়ার সৃষ্টির খেদমত আঞ্জাম দিয়ে থাকে, সে মূলত মোহ সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে অর্থকড়ি খসানোর খেদমত(?) আঞ্জাম দিয়ে থাকে। তারপর গভীর রাতে তাদের নিজস্ব অংশীদারদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে থাকে। এছাড়া যারা শক্তি ও বুদ্ধির দুর্বলতার জন্য বড় বড় মাজারের ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারে না কিংবা বিতাড়িত হয়, তারা তখন হয় স্বপ্ন দেখতে শুরু করে যে, অমুক সড়ক পথের ধারে তমুক বাবার কবর, কিংবা মাটি উঁচু করে তাতে লালশালু বিছিয়ে বসে যায় ডাকাতির ধান্ধায়। আর এতে তাদের একমাত্র পুঁজি হলো মানুষের ধর্মপ্রীতি, তবে অবশ্যই স্বল্পজ্ঞান ও অজ্ঞান মানুষদেরই কেবল; জ্ঞানী ও দ্বীন সম্পর্কে শিক্ষিতদের দ্বীনপ্রীতি নয় এবং নিজেদের অতি উর্বর মস্তিষ্ক।
৩) সংরক্ষণ: একথা ঠিক যে, অনেকেই প্রিয়জনদের কবরকে সংরক্ষণ করার জন্য কবরের চারপাশে দেয়াল দিয়ে সুরক্ষিত করার চেষ্টা করে থাকেন। নিয়ত ঠিক থাকলেও শরীয়ত-পরিপন্থী হওয়ার কারণে এটাও বর্জনীয়। যুক্তি তর্কে গেলে অনেক কথাই বলা যায় যে, পৃথিবীর আদি থেকে যদি মৃতদের কবরগুলোকে আলাদা আলাদাভাবে সংরক্ষণ করার জন্য দেয়াল দেয়া চলতে থাকতো, তবে পৃথিবীতে হয়ত জীবিতদের থাকার জন্য ঘর নির্মাণ করার মত কোন জায়গা থাকতো না। বরং সেদিকে না গিয়ে আমাদের দেখতে হবে যে, প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে কী দিকনির্দেশনা দান করেছেন আমাদেরকে। তিনি একবার আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে প্রেরণ করেন এই বলে যে, মদীনার সকল উঁচু কবরগুলোকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে আস; তিনি তাই করলেন। এ ব্যাপারে আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর ভাষ্য হলো: তিনি (আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু) আবুল হাইয়াজ আল আসাদীকে বলেছিলেন 'আমি কি তোমাকে এ জন্য পাঠাবো না যে জন্য আমাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঠিয়েছিলেন?) সুতরাং আলাদা দেয়াল অথবা প্রাসাদ নির্মাণের তো কোন প্রশ্নই আসে না; বরং কবরকে দীর্ঘদিন অতিরিক্ত উঁচু করে রাখাও সঠিক পন্থা নয়। তাই উচিত হবে সম্পূর্ণ কবরস্থানকে ঘিরে দেয়াল অথবা বেড়া করে দেয়া যাতে গবাদি পশু ও অন্যান্য সকল প্রকার অনিষ্টতা থেকে কবরগুলোকে রক্ষা করা যায়। এটাই সঠিক ও উত্তম পন্থা।
অতএব, বিস্তারিত আলোচনা থেকে এটাই সুস্পষ্ট হলো যে, কবরের উপর দেয়াল নির্মাণ, প্রাসাদ নির্মাণ, মসজিদ নির্মাণ, কবরকে ঈদগাহ বা উৎসবের স্থান বানানো, কবরের উপরে বসা, কবরের প্রতি সালাত আদায় করা, নযর-মান্নত করা, মোমবাতি দেয়া, দূর-দূরান্ত থেকে সেদিকে সফর করা, কবরে রাখা লালশালু ঢাকা মটকায় অর্থকড়ি দান করা ইত্যাদি কর্মকাণ্ড সুস্পস্ট শিরক বা আল্লাহর সাথে অংশীবাদ, জাহেলী বা মূর্খতা বা গোমরাহী বা পথভ্রষ্টতা এবং কুসংস্কারও বটে।
পরিশেষে: মুসলমানদের কবর পবিত্র রাখার স্থান, তাই সংরক্ষণ করা ভাল এবং প্রয়োজনও কিন্তু তা আলাদা আলাদা করে প্রত্যেকটি কবরে দেয়াল তুলে নয়; বরং পুরো কবরস্থানকে ঘিরে অপচয়হীন দেয়াল তুলে দেয়া যেতে পারে যাতে প্রাণীকুল কিংবা দুষ্ট লোকেরা সেখানে কোনরূপ খারাপ কিছু সংঘটিত করতে না পারে। তদ্রূপ কবর যিয়ারত করা যেতে পারে যেভাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন- আখেরাতের ভাবনা জাগরিত করার জন্য এবং সঠিক পন্থায় সঠিক দো'আ পড়ার মাধ্যমে; কমও নয় বেশীও নয়। তাতেই যাবতীয় কল্যাণ নিহিত রয়েছে আমাদের জন্য। অন্যথা হলে তা কোন না কোনভাবে শিরক, বিদ'আত কিংবা ভ্রস্টতার পর্যায়ে যেতে বাধ্য!
তাই আসুন, কবর ও কবরবাসীদের ব্যাপারে সাবধান হই। তাদেরকে তাদের যথাযথ অবস্থান দান করার মাধ্যমে কবরবাসীকেও নিষ্কলুষ রাখি এবং নিজেরাও নিরাপদ থাকি শিরক থেকে, গোমরাহী থেকে ও কুসংস্কার থেকে, এমনকি অর্থকড়ির অপচয়মূলক জাগতিক ক্ষতি থেকেও। যেমনটি আল্লাহ্ আমাদের সম্পর্কে বলেছেন:
তাদেরকে এ ছাড়া অন্য কোন নির্দেশ দেয়া হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদাত করবে, সালাত প্রতিষ্ঠা করবে এবং যাকাত আদায় করবে; এটাই সঠিক দ্বীন। [সূরা আল-বাইয়্যিনাহ: ৫]
আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন ইরশাদ করেন:-
যে নিজেকে শুদ্ধ করে, সেই সফলকাম হয়। এবং যে নিজেকে কলুষিত করে, সে ব্যর্থ মনোরথ হয়। [সূরা আশ-শামস, আয়াত ৯-১০]
নিষিদ্ধ পদ্ধতিতে কবর / মাজার যিয়ারত করাঃ
কবর যিয়ারত করা ইসলামের একটি নির্দেশিত বিষয় হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে যে ধরনের যিয়ারত শুরু হয়ে গেছে, সেগুলো পরিপূর্ণ হারাম। যারা অজ্ঞ, তারা নির্দিষ্ট দিন সমূহে ফুল দিয়ে মৃতের কবর কে সাজিয়ে আবার একজন হুজুর কে নিয়ে এসে দোয়ার ব্যবস্থা করে। এই সকল পদ্ধতিতে কবর যিয়ারত করা সম্পূর্ণ রূপে হারাম। ইসলাম আমাদেরকে কবর যিয়ারত করতে শিখিয়েছে; ফুল দিয়ে পূজা করতে শেখায়নি।
কবর যিয়ারতের নামে কিছু লোক কোন মাজারে যেয়ে সেই পীর বা আউলিয়ার কাছে অনেক কিছু চেয়ে থাকে এবং তাদের সন্তুষ্টির জন্য বিভিন্ন প্রকার সাদকা বা মান্সিক করে থাকে। তারা সকলেই মনে করে যে, তাদের চাওয়া অনুসারে পীর-আউলিয়াদের দেয়ার মত সকল ক্ষমতাই আছে। আর তাদের এইরূপ কল্পিত আকিদা সম্পূর্ণ রূপে হারাম এবং শিরকি গুনাহ। প্রত্যেকেরই মনে রাখা উচিৎ যে, মানুষ মরে গেলে তার সকল ক্ষমতাই শেষ হয়ে যায়। পীর-আউলিয়া-গনও এর থেকে ব্যতিক্রম নয়। আল্লাহর সর্ব শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের-ই এই সকল বিষয়ে কোন ক্ষমতা নেই, আর অন্য আত্মার যে কি ক্ষমতা আছে, তা নিজেরা চিন্তা করে বের করে নিবেন এবং পূর্বের শিরকি গুনা সমূহের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাবেন। আল্লাহ সর্বাবস্থায় বান্দার পাপ ক্ষমা করার জন্য অপেক্ষমাণ।
আমরা যদি কেউ আমাদের পিতা-মাতার জন্য নিজে দোয়া করি, তাহলে যতটুকু কাজে লাগবে, অপর পক্ষে তামাম জাহানের সকল মুসলমান নারী-পুরুষ যদি এক সাথে আমাদের পিতা-মাতার জন্য দোয়া করে, তাহলেও ততটুকু কাজে লাগবে না। কারণ: কোন ব্যক্তি মৃত্যু বরন করার সাথে সাথেই তার সকল আমল নামা বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীর জন্য শুধুমাত্র তিনটি পথ খোলা হয়ে থাকে, তার মধ্যে একটি হল মৃত ব্যক্তির সন্তান সমূহ।
কবরবাসীর পূজা কিংবা কবরের উপর প্রাসাদ নির্মাণ করা হারামঃ
মহান আল্লাহ্ তা'আলা মানব জাতির জন্য নির্ভেজাল ও সুসামঞ্জস্যপূর্ণ এমন এক জীবন ব্যবস্থা দান করেছেন, যা থেকে আমরা যেমন সত্য ও সঠিকের দিকনির্দেশনা পাই তেমনি পাই মিথ্যা ও ভ্রান্তির পরিচিতিও। এটা এ জন্যে যে, দয়াময় আল্লাহ্ আমাদের কল্যাণ চান। তাই কোথায়, কোন পথের কোন বাঁকে ওঁত পেতে আছে অকল্যাণ সে ধারণা আমাদেরকে পূর্ব হতেই জানিয়ে দিয়েছেন; যাতে আমরা সতর্ক থাকতে পারি।
বান্দার জন্য ভালবাসার সবটুকু কিংবা সর্বোচ্চটুকু হওয়া উচিত তার প্রতিপালকের প্রতি। যেমনটি তিনি বলেছেন:
তারপর যখন তোমরা হজ্জের অনুষ্ঠানাদি সমাপ্ত করবে তখন আল্লাহকে এমনভাবে স্মরণ করবে যেভাবে তোমরা তোমাদের পিতৃপুরুষদের স্মরণ করে থাক, অথবা তারচেয়েও অধিক। [সূরা আল-বাকারা: ২০০]
সুতরাং পূর্বপুরুষ বা সম্মানিত কোন ব্যক্তিত্ব যত প্রিয়ই হোক না কেন; আল্লাহ্ বলছেন যে, তার চেয়েও অধিক ভালবাসা বান্দার কাছ থেকে তাঁর প্রাপ্য। বান্দার উচিত অন্তরে তার রবের প্রতি ভালবাসার সর্বোচ্চ মাত্রাকে জাগরিত রেখে তাঁকে স্মরণ করা।
অন্যত্র তিনি বলেন:
আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহ্ ছাড়া অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে, তারা তাদেরকে ভালবাসে আল্লাহর ভালবাসার মতই ; পক্ষান্তরে যারা ঈমান এনেছে তারা আল্লাহকে সর্বাধিক ভালবাসে। কতইনা উত্তম হত যদি এ জালেমরা পার্থিব কোন কোন আযাব প্রত্যক্ষ করেই উপলব্ধি করে নিত যে, যাবতীয় ক্ষমতা শুধুমাত্র আল্লাহরই জন্য এবং আল্লাহর আযাবই সবচেয়ে কঠিনতর। [সূরা আল-বাকারা: ১৬৫]
সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, যারা অন্য কোন মানুষকে আল্লাহর আল্লাহর ভালবাসার মত করে ভালবাসে তারা মূলত সেই ব্যক্তিকে নিজ নিজ অন্তরে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে নিয়েছে। আর আল্লাহর জন্য সমকক্ষ নির্ধারণ করা সুস্পষ্ট শিরক। পরন্তু আয়াতের পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে যে, মুমিনগণই শুধুমাত্র আল্লাহকে তাদের অন্তরের সর্বোচ্চতা দিয়ে ভালবাসে অর্থাৎ, এর ব্যতিক্রমীরা ঈমানের দিক থেকে সুস্পষ্ট বিপদাশংকায় নিমজ্জিত।
তাহলে একথা সুস্পষ্ট যে, যারা কবরবাসীকে ভালবাসার কারণে কবরের উপরে সুরম্য দেয়াল বা প্রাসাদ নির্মাণ করে অথবা কবরবাসীকে ডাকে তারা প্রকারান্তরে সেই কবরবাসীকে আল্লাহর সমকক্ষ হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে। যার ভয়াবহ পরিণাম সুস্পষ্ট শিরক!
রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ( لَا تَجْلِسُوا عَلَى الْقُبُورِ وَلَا تُصَلُّوا إِلَيْهَا) কবরের উপর (আসন গেঁড়ে বা ইমারত বানিয়ে) বসো না এবং তার দিকে (কবরের দিকে) সালাত আদায় করো না। [মুসলিম: ১৬১৩, আবূ দাউদ: ২৮১০, তিরমিযী: ৯৭১, আহমাদ: ১৬৫৮৪]
কবরের উপর মসজিদ স্থাপন করা ও তাতে বাতি জ্বালানো প্রসঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ হতে আরো বর্ণিত আছে যে: তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কবরসমূহে নারী যিয়ারতকারিনীদের, সেখানে (কবরের উপর) মসজিদ স্থাপনকারীদের এবং সেসবে (কবরসমূহে) বাতি জ্বালানোওয়ালাদের প্রতি অভিসম্পাত বর্ষণ করেছেন। [আবু দাউদ: ২৮১৭, তিরমিযী: ২৯৪, নাসায়ী: ২০১৬, আহমাদ: ১৯২৬, ২৪৭২, ২৮২৯, ২৯৫২]
এছাড়াও কবরস্থানে মসজিদ তৈরি করা কিংবা মসজিদে কবর বানানো ইসলামে হারাম বলে ঘোষিত হয়েছে। কেননা কবরের প্রতি সম্মান দেখানো ও তাতে ইবাদত করা পর্যায়ক্রমে শির্কের মত অধঃপতনের প্রতি মানুষকে নিয়ে যায়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: আল্লাহ তাআ’লার অভিশাপ ইহুদি ও খৃষ্টানদের উপর তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছে। [বুখারী ও মুসলিম]
ওরস পালন করা বা মাজার পূজা করাঃ
ওরস অর্থই কারও মৃত্যু দিবসকে বাৎসরিক ভাবে ঘটা করে পালন করা। আমাদের দেশে সাধারণত পীর, পাগলা বাবা, ফকির উপাধি ধারি ব্যক্তিগণের মৃত্যু দিবসকে তাদের জীবিত কালীন কিছু অনুসারী গনের সমন্বয়ে গঠিত রম-রমা ভাবে পালিত উৎসবকেই ওরস বলে। অনুসারীগণ যদিও নামাজ-কালামের ধারে-কাছে না থাকলেও তাদের ধারনা যে, যার নামে তারা ওরস করছে, তিনি যদি খুশি থাকেন, তাহলে আর পর-কালীন মুক্তির জন্য কোন প্রকার অসুবিধা নেই। কারণ যার উদ্দেশ্যে ওরস করা হচ্ছে, সেই ব্যক্তির দ্বারাই তাঁর সকল অনুসারীদের জন্য মুক্তির ব্যবস্থা করা সম্ভব (নাউজুবিল্লাহ)।
আসলে ওরস মানে কিছু ভণ্ড লোকদের সমন্বয়ে গাজা, ভাং এবং অন্যান্য অবৈধ নেশাযুক্ত সামগ্রী সরকারের পুলিশ বাহিনীর উপস্থিতিতে বৈধ ভাবে খেয়ে ফকিরান্তি বা সেই দরবার সংক্রান্ত বিভিন্ন দলীয় সংগীত পরিবেশন এবং মাতলামি সহ বাস্তব ভণ্ডামির একটা বহিঃপ্রকাশ মাত্র। ইসলামে এর কোন অস্তিত্ব নেই। স্মরণ করা উচিৎ যে, যদি কারও ওরস ইসলামে জায়েজ থাকত, তাহলে সর্ব প্রথমে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর ওরসের ব্যবস্থা করা হত।
অথচ রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “তোমারা আমার কবরকে সিজদার স্থানে পরিণত করো না, কারণ তোমাদের পূর্ববর্তীদের ধ্বংস হওয়ার কারণ ছিল তাদের নবীদের কবরকে সিজদার স্থানে রূপান্তর করা”।
বায়েজিদ বোস্তামীর মাজারের যে বিষয়টি লক্ষণীয় মনে হয়েছে, তাহলো সেখানকার কচ্ছপ গুলোর গায়ে শেওলা পরে এমন একটা অবস্থা হয়ে গেছে যে, দেখলেই গা শির শির করে, অথচ কিছু লোক সেই কচ্ছপের গায়ে হাত দিয়ে সেই ময়লা আবার কল্যাণ লাভের আশায় নিজের মুখে শরীরে লাগায়। একটা গাছে মনে হয় লক্ষাধিক সুতা বাধা আছে, কারণ হল ঐ গাছে নিয়ত করে সুতা বাধলে না-কি সকল প্রকার মুশকিল আছান হয়ে যায়। এই ধরনের তথ্য মানা তো দূরে থাকুক, চিন্তা করাও বিশাল শিরকি বা কবিরা গুনাহ। সুন্নাতের দৃষ্টিতে মাজারের সকল কার্যক্রম হারাম।
আসুন সংক্ষেপে জেনে নেয়া যাক যে, কবরের উপর দেয়াল বা প্রাসাদ কেন নির্মাণ করা হয়:- ১) ইবাদাত, ২) ব্যবসা ও ৩) সংরক্ষণ।
১) ইবাদাত: একটা গোষ্ঠী আছে যারা অতিভক্তি, ভালবাসা, শ্রদ্ধার সাথে সাথে শয়তান কর্তৃক প্ররোচণায় নিপতিত হয়ে নিজেদের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের ভাস্কর্য নির্মাণ করতে শুরু করে, তারপর পর্যায়ক্রমে তাতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে শুরু করে, তারপর ঘরে ঘরে তা স্থাপন করে এবং অবশেষে শয়তান তাদেরকে দিয়ে ঐসব ভাস্কর্য তথা মূর্তির পায়ে কিংবা বেদীতে আন্তরিক, নযর-মান্নত এমনকি মস্তক নোয়ানো বা সিজদা করার মত ইবাদাত আদায় করতে সক্ষম হয়। ইসলাম যাকে সুস্পষ্টভাবে বড় শিরক বলে আখ্যায়িত করেছে এবং যার পরিণতি আক্বীদা-বিশ্বাসে ব্যক্তি ইসলামের সীমানা থেকে বহিস্কার হয়ে যায়, সমাজে তার নাম আব্দুর রহমান কিংবা বদর উদ্দীন যাই হোক না কেন।
২) ব্যবসা: সমাজের কিছু ধূরন্ধর মানুষেরা যখন উপরোল্লেখিত মূর্খ ও বিভ্রান্ত একটা গোষ্ঠীর সন্ধান পেয়ে যায়, তখন শয়তানের চক্রান্তে ও প্ররোচণায় তাদের মাথায় ব্যবসায়ী একটা চিন্তা খেলে যায়। তারা তখন শক্তি ও বুদ্ধিমত্তা অনুযায়ী ব্যবসার কাঠামো সাজিয়ে ফেলে এবং মাজার দখল করে বসে। এজন্য দেখবেন প্রত্যেক মাজারে খাদেম রয়েছে, কি কাজ খাদেমের? মৃত ব্যক্তি কি খেদমত নেন তার কাছ থেকে? সে মূলত জীবিত লোকদের চোখে ধোঁয়ার সৃষ্টির খেদমত আঞ্জাম দিয়ে থাকে, সে মূলত মোহ সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে অর্থকড়ি খসানোর খেদমত(?) আঞ্জাম দিয়ে থাকে। তারপর গভীর রাতে তাদের নিজস্ব অংশীদারদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে থাকে। এছাড়া যারা শক্তি ও বুদ্ধির দুর্বলতার জন্য বড় বড় মাজারের ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারে না কিংবা বিতাড়িত হয়, তারা তখন হয় স্বপ্ন দেখতে শুরু করে যে, অমুক সড়ক পথের ধারে তমুক বাবার কবর, কিংবা মাটি উঁচু করে তাতে লালশালু বিছিয়ে বসে যায় ডাকাতির ধান্ধায়। আর এতে তাদের একমাত্র পুঁজি হলো মানুষের ধর্মপ্রীতি, তবে অবশ্যই স্বল্পজ্ঞান ও অজ্ঞান মানুষদেরই কেবল; জ্ঞানী ও দ্বীন সম্পর্কে শিক্ষিতদের দ্বীনপ্রীতি নয় এবং নিজেদের অতি উর্বর মস্তিষ্ক।
৩) সংরক্ষণ: একথা ঠিক যে, অনেকেই প্রিয়জনদের কবরকে সংরক্ষণ করার জন্য কবরের চারপাশে দেয়াল দিয়ে সুরক্ষিত করার চেষ্টা করে থাকেন। নিয়ত ঠিক থাকলেও শরীয়ত-পরিপন্থী হওয়ার কারণে এটাও বর্জনীয়। যুক্তি তর্কে গেলে অনেক কথাই বলা যায় যে, পৃথিবীর আদি থেকে যদি মৃতদের কবরগুলোকে আলাদা আলাদাভাবে সংরক্ষণ করার জন্য দেয়াল দেয়া চলতে থাকতো, তবে পৃথিবীতে হয়ত জীবিতদের থাকার জন্য ঘর নির্মাণ করার মত কোন জায়গা থাকতো না। বরং সেদিকে না গিয়ে আমাদের দেখতে হবে যে, প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে কী দিকনির্দেশনা দান করেছেন আমাদেরকে। তিনি একবার আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে প্রেরণ করেন এই বলে যে, মদীনার সকল উঁচু কবরগুলোকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে আস; তিনি তাই করলেন। এ ব্যাপারে আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর ভাষ্য হলো: তিনি (আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু) আবুল হাইয়াজ আল আসাদীকে বলেছিলেন 'আমি কি তোমাকে এ জন্য পাঠাবো না যে জন্য আমাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঠিয়েছিলেন?) সুতরাং আলাদা দেয়াল অথবা প্রাসাদ নির্মাণের তো কোন প্রশ্নই আসে না; বরং কবরকে দীর্ঘদিন অতিরিক্ত উঁচু করে রাখাও সঠিক পন্থা নয়। তাই উচিত হবে সম্পূর্ণ কবরস্থানকে ঘিরে দেয়াল অথবা বেড়া করে দেয়া যাতে গবাদি পশু ও অন্যান্য সকল প্রকার অনিষ্টতা থেকে কবরগুলোকে রক্ষা করা যায়। এটাই সঠিক ও উত্তম পন্থা।
অতএব, বিস্তারিত আলোচনা থেকে এটাই সুস্পষ্ট হলো যে, কবরের উপর দেয়াল নির্মাণ, প্রাসাদ নির্মাণ, মসজিদ নির্মাণ, কবরকে ঈদগাহ বা উৎসবের স্থান বানানো, কবরের উপরে বসা, কবরের প্রতি সালাত আদায় করা, নযর-মান্নত করা, মোমবাতি দেয়া, দূর-দূরান্ত থেকে সেদিকে সফর করা, কবরে রাখা লালশালু ঢাকা মটকায় অর্থকড়ি দান করা ইত্যাদি কর্মকাণ্ড সুস্পস্ট শিরক বা আল্লাহর সাথে অংশীবাদ, জাহেলী বা মূর্খতা বা গোমরাহী বা পথভ্রষ্টতা এবং কুসংস্কারও বটে।
পরিশেষে: মুসলমানদের কবর পবিত্র রাখার স্থান, তাই সংরক্ষণ করা ভাল এবং প্রয়োজনও কিন্তু তা আলাদা আলাদা করে প্রত্যেকটি কবরে দেয়াল তুলে নয়; বরং পুরো কবরস্থানকে ঘিরে অপচয়হীন দেয়াল তুলে দেয়া যেতে পারে যাতে প্রাণীকুল কিংবা দুষ্ট লোকেরা সেখানে কোনরূপ খারাপ কিছু সংঘটিত করতে না পারে। তদ্রূপ কবর যিয়ারত করা যেতে পারে যেভাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন- আখেরাতের ভাবনা জাগরিত করার জন্য এবং সঠিক পন্থায় সঠিক দো'আ পড়ার মাধ্যমে; কমও নয় বেশীও নয়। তাতেই যাবতীয় কল্যাণ নিহিত রয়েছে আমাদের জন্য। অন্যথা হলে তা কোন না কোনভাবে শিরক, বিদ'আত কিংবা ভ্রস্টতার পর্যায়ে যেতে বাধ্য!
তাই আসুন, কবর ও কবরবাসীদের ব্যাপারে সাবধান হই। তাদেরকে তাদের যথাযথ অবস্থান দান করার মাধ্যমে কবরবাসীকেও নিষ্কলুষ রাখি এবং নিজেরাও নিরাপদ থাকি শিরক থেকে, গোমরাহী থেকে ও কুসংস্কার থেকে, এমনকি অর্থকড়ির অপচয়মূলক জাগতিক ক্ষতি থেকেও। যেমনটি আল্লাহ্ আমাদের সম্পর্কে বলেছেন:
তাদেরকে এ ছাড়া অন্য কোন নির্দেশ দেয়া হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদাত করবে, সালাত প্রতিষ্ঠা করবে এবং যাকাত আদায় করবে; এটাই সঠিক দ্বীন। [সূরা আল-বাইয়্যিনাহ: ৫]









0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন